জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘যুগান্তকারী’ কৌশল উদ্ভাবন ঢাবির

বাংলাদেশ

রাজধানী ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি ক্রমান্বয়ে গভীর থেকে গভীরে চলে যাওয়ায় পানির সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এতে পানি উত্তোলনে খরচ যেমন বাড়ছে তেমনি অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে ভূপৃষ্ঠের ও ভূগর্ভের গঠন প্রকৃতিও পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদী নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন করছে রাজধানীকে। যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার। কিন্তু টেকসই কোন সমাধান হচ্ছে না।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগরসহ অন্যান্য মহানগরীতে বৃষ্টির পানিতে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। প্রতি বছর বর্ষাকালে এ সমস্যায় নগরবাসীকে পরতে হচ্ছে ব্যাপক ভোগান্তি। এতে নষ্ট করছে মানুষের মূল্যাবান কর্মঘণ্টা। আবার এই সমস্যা সমাধানে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজে আসছে না। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নানা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন থাকলেও টেকসই সমাধান নিয়ে অনিশ্চিত রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর এই দুই প্রধান সমস্যা দূর করতে গবেষণা চালিয়ে একটি ‘যুগান্তকারী’ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একটি গবেষক দল। উদ্ভাবিত এ পদ্ধতির পরীক্ষা করে করে শতভাগ সফলতা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।

তাদের দাবি অনুযায়ী, উদ্ভাবিত পদ্ধতিটি দেশের গবেষণার নতুন মাত্রা যোগ করবে। যেটি খুবই স্বল্প খরচের দীর্ঘমেয়াদী সব সমস্যার টেকসই সমাধান নিয়ে আসবে।

সামগ্রিক বিষয় বিজ্ঞানভিত্তিক হিসেব-নিকেশ করে পদ্ধতিটি উদ্ভাবনের পর সম্প্রতি একটি পাইলট প্রকল্প হতে নিয়ে এমন সফলতার পাওয়ার দাবিই তুলেছেন গবেষক দলটি।

উদ্ভাবিত পদ্ধতিটির পরীক্ষার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হওয়ায় গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু রাজধানীর ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য দেশের শহরের পাশাপাশি বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর জন্য বড় সংবাদ। এটি শহরগুলোর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখা ও ভারী বৃষ্টিতে তৈরি হওয়া মহাদুর্ভোগ জলাবদ্ধতার চিন্তা দূর করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অনুষদের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের নেতৃত্বে গবেষক দলটি যুগান্তকারী এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এই উদ্ভাবনের সঙ্গে আরো ছিলেন ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞাসহ কয়েকজন।

এ বিষয়ে গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রথমত বৃষ্টি হলেই ঢাকা মহানগরীসহ অন্যান্য মহানগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে জনজীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতার প্রভাব অর্থনীতির ওপরও পরছে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নীচে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর প্রায় ৩ মিটার হারে নিচে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ভূগর্ভের জলাধার পুনর্ভরণ হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, অন্যদিকে ঢাকা মহানগরীর ভূপৃষ্ঠ প্রতি বছর ১২.২৩ মিলি মিটার হারে দেবে যাচ্ছে। কিছু স্থানে ভূমির অসম দেবে যাওয়ার কারণে সেই স্থানের ইমারত হেলে পড়ার ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। নগরীর জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভের পানির স্তর নীচে নেবে যাওয়া- এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগকে আমাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির মাধ্যমে দুর্যোগ প্রশমন করার চেষ্টা করেছি।

গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, একটা সময় কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। সিম্পল একটা আবিষ্কার এক চিমটি লবণ, একমুঠো গুড় আর আধা কেজি পানি গুলিয়ে খেলেই প্রাণ বেঁচে যেতো। এটা একটি তেমনই যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে আমরা মনে করি। এটা আসলেই অনেক কার্যকর একটা পদ্ধতি হবে বাংলাদেশের জন্য। শুধু ঢাকা নগরীতে না দেশের বড় বড় শহরে এই পদ্ধতিটা প্রয়োগ করতে পারি।

কি সেই উদ্ভাবন

এটি ‘পানি পুনরুদ্ধার কুপ’ নামক একটি পদ্ধতি। নগরায়ণের ফলে ভূমির উপরের প্রায় ৮০% অংশ পাকা হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ফলে ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন হয়েছে। ‘পানি পুনরুদ্ধার কুপ’ সেটির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। শহরের যেখানে যেখানে পানি জমে যায় সেখানে কুপ খনন করে তার সাথে রিচার্জ চ্যানেল সংযুক্ত করে দেয়া হবে। এতে পানি দ্রুত ভূগর্ভে চলে যাবে। জলাবদ্ধতা হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *